সৌদি-আমিরাত জোটের কাতার অবরোধ কি আজ ব্যর্থ!

মো.আতিকুর রহমান আতিক: সৌদি-আমিরাত জোটের কাতারের উপর অবরোধের তিন বছর হয়ে গেল।কিন্তু কাতারের উপর এই অবরোধ করে সৌদি-আমিরাত জোট কি অর্জন করল,সেটা খুঁজতে ব্যর্থ খোদ অবরোধকারীরাই। তবে কি তাদের এই অবরোধ মুখ থুবড়ে পড়েছে!সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ব্যস্ত রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই এখন এ অবরোধ তুলে নেয়ার জন্য উদ্যোগী হয়েছেন। গত বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ সংক্রান্ত আলোচনায় এরই মধ্যে অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে নমনীয়তা দেখা গেছে।অথচ অবরোধের প্রাথমিক পর্যায়ে আমেরিকা সৌদি-আমিরাত জোটের পক্ষে অবস্থান করেছিল।  ২০১৭ সালের ৫ জুন কথিত সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের অভিযোগ এনে কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে সৌদি আরব, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিসর। তবে সৌদি জোটের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে কাতার। বরং এ অবরোধকে রক্তপাতহীন যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলে মন্তব্য করে কাতার।  কাতারের সাথে সম্পর্ক অবনতির কারণ বিশ্লেষণ করতে হলে, আমাদের একটু পিছন ফিরে তাকাতে হবে।ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০১১ সালে সংঘটিত আরব বসন্তকে কেন্দ্র করে।সেসময় কাতারের স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি আমিরাত-সৌদিজোটভুক্ত দেশসমূহকে ভাবিয়ে তুলছিল। এছাড়া কাতারের মালিকাধীন মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় মিডিয়া আল জাজিরার আরব বসন্তকে সমর্থনও আরবের রাজতান্ত্রিক দেশের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে।আলজাজিরার অব্যাহত সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে আরব বসন্ত সাফল্য লাভ করে।তিউনিসিয়া থেকে শুরু হয়ে একে একে মিশর,লিবিয়ার একনায়কতান্ত্রিক সরকারগুলো ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় সৌদি,আমিরাত,বাহরাইন সহ রাজতান্ত্রিক দেশগুলো ক্ষমতা হারানোর ভয়ে কাতার ও আল-জাজিরার বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠে। কাতারের বিরুদ্ধে অবরোধ প্রত্যাহারে যে ১৩ দফা দাবি তুলে ধরে সৌদি জোট। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল আলজাজিরা টেলিভিশন বন্ধ করে দেয়া।  এছাড়া মুসলিম বিশ্ব তথা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া তুরস্কের সঙ্গে কাতারের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও কাতারে অবস্থিত তুরস্কের সামরিক ঘাটি স্থাপন সৌদিজোট কখনো মেনে নিতে পারেনি।তাছাড়া আরো কিছু উল্লেখযোগ্য কারণের মধ্যে রয়েছে ফিলিস্তিনের হামাস, আফগানিস্তানের তালেবান,মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে কাতারের কূটনৈতিক সম্পর্ক।যেটাকে সৌদি-আমিরাত গোষ্ঠী নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে।এসব বিষয়ে সৌদি জোট কাতারকে নানাভাবে হুমকি দেয়ার পরও কাতার নিজস্ব নীতি থেকে না আসার ফলে ২০১৭ সালের ৫ জুন আমিরাত,সৌদি আরব,বাহরাইন,মিসর একজোটকে হয়ে কাতারের ওপর কূটনৈতিক,  বাণিজ্যিক,স্থল ও সমুদ্র যোগাযোগ,  এমনকি আকাশ পথেও অবরোধ আরোপ করে। যা ‘কাতার ব্লক’ নামে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রচারিত হয়। প্রাথমিক অবরোধ আরোপের পর কাতারে সাময়িক সমস্যা দেখা দিলেও সেই ধাক্কা ইতোমধ্যে সামলে উঠেছে কাতার।সৌদি জোটের আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ তুরস্ক ও ইরানের দিকে আরো বেশি ঝুঁকে পড়ে কাতার।এমতাবস্থায় কাতারকে নিজেরদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেয় ইরান।অপরদিকে তুরস্ক খাদ্য সহ বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন দ্রব্য সামগ্রী সরবরাহ করে।  ফলশ্রুতিতে কাতার ইরান ও তুরস্ককে নিজেদের পরীক্ষিত বন্ধু হিসেবে আখ্যা দেয়।বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম সহ বিভিন্ন ইস্যুতে এই ত্রয়ী দেশ একে অপরের সাহায্যে সর্বদা এগিয়ে আসতে শুরু করে।তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় লিবিয়া ও সিরিয়াতে।তুরস্ক কাতারের অর্থ সহায়তা ও ইরানকে পাশে রেখে সিরিয়ার বিশাল এলাকা ইতোমধ্যে  দখল করেছে।শুধু তাই-ই নয়,লিবিয়ায় কাতার ও তুরস্ক জোট জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারের পক্ষে লড়ছে।যার প্রতিপক্ষ হিসেবে সৌদি-আমিরাত জোটের সমর্থনপুষ্ট অবৈধ যুদ্ধবাজ নেতা খলিফা হাফতার।দেখা যাচ্ছে লিবিয়াতেও কাতার-তুরস্ক জোট ব্যাপক সাফল্য অর্জন করছে।শুধু তাই-ই নয়,কাতার-তুরস্ক-ইরান জোটের সাথে পাকিস্তান ও চীন সহ বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিমদেশ কাজ করতে ব্যাপক আগ্রহী।যার সর্বশেষ উদাহরণটি আমরা দেখতে পাই ইরানের চাবাহার বন্দরের রেলপ্রকল্প থেকে ভারতকে বাদ দেয়া।ভারত হচ্ছে আমেরিকা-আমিরাত-ইসরায়েল-সৌদি জোটের অন্যতম শরীক।  শুধু তাই-ই নয়,চীন ইরানে ২৫ বছর মেয়াদি ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে,এমনকি চুক্তি অনুযায়ী চীনা সামরিক বাহিনী ইরানে প্রবেশ করতে পারবে।যাতে করে চিন্তার ভাজ পড়ে গেছে আমেরিকা সহ আরবজোটের কয়েকটি দেশের। সৌদি-আমিরাত-ইসরাইল বলয়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ট্রাম্প শুরুতে কাতারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও। তবে শেষ পর্যন্ত কৌশলগত দিক বিবেচনায় ওই অবস্থান থেকে সরে আসেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটির অবস্থান কাতারে। ওয়াশিংটনের কাছে আল-উদেইদ নামের এই ঘাঁটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।এছাড়া ওয়াশিংটন মনে করে, এ অঞ্চলে তার মিত্রদের মধ্যে বিবাদ ইরানকেই লাভবান করবে। যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ইরানের আকাশসীমা ব্যবহারের ফলে কাতারের মাধ্যমে ইরানের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বহুল অর্থ যোগান হচ্ছে।শুধু তাই-নয় কাতারের মার্কিন সামরিক ঘাঁটির সেনাদেরও ইরানের আকাশপথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এর ফলে সেনাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন মার্কিন প্রশাসন।ফলে যেকোনো মূল্যে নিজের মিত্রদের ইরানবিরোধী একই প্ল্যাটফর্মে রাখতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন।এমতাবস্থায় সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য আমেরিকা সৌদি-আমিরাত জোটকে যথেষ্ট চাপ দিচ্ছে। শুধু কি তাই, সৌদি নিয়ন্ত্রিত মুসলিম জোট ওআইসির বিকল্প হিসেবে তুরস্ক ও ইরানের নেতৃত্বাধীন নতুন জোট গঠন করা হচ্ছে।যেটার অন্যতম অংশীদার হলো কাতার।ফলে মুসলিম বিশ্বে নেতৃত্ব হারানোর ভয়ে নিশ্চয় সৌদি-আমিরাত জোট নিশ্চয় কাতারের সাথে পুনরায় সম্পর্ক উন্নয়নের চেস্টা করবে। এছাড়া কাতারের সাথে সৌদি জোটের দহরম-মহরম খেলার মাঠেও গড়িয়েছে।কাতার ২০২২ বিশ্বকাপ আয়োজক দেশ।অথচ কাতারে যেন এ বিশ্ব আয়োজন না হয় এর জন্য সবকিছুই করেছিল সৌদি জোট।তবে সব ষড়যন্ত্র ভণ্ডুল করে দিয়ে ইতোমধ্যে কাতারে বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের সূচিও প্রকাশিত হয়েছে।আর এই ফুটবলই সৌদি জোটকে কাতারের কাছে নিয়ে যাচ্ছে।এমনিতেই আরব যুবকদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। মধ্যপ্রাচ্যের কোন দেশে প্রথমবারের মতো হতে যাওয়া ফুটবল বিশ্বকাপ নিশ্চয় আরববাসী স্ব-চক্ষে দেখতে চাইবে।কিন্তু তাদের এ চাওয়া ব্যর্থ হবে যদি না এ অবরোধ তুলে না নেয়া হয়।কাতার ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে স্যাটেলাইট সম্প্রচারের মাধ্যমেও অবরোধকারী কোন দেশে খেলা দেখানো হবে না।ফলশ্রুতিতে এসব দেশের সাধারণ মানুষের চাপে ‘অবরুদ্ধ’ কাতারের দরজায় নিজেরাই কড়া নাড়বে।যা কাতারের জন্য এক বিরাট সাফল্য।  অতএব দেখা যাচ্ছে,সৌদি-আমিরাত জোট যে পরিকল্পনা নিয়ে কাতারের উপর অবরোধ দিয়েছিল তা আজ পুরোপুরি ব্যর্থ।  এভাবে একে একে বিপদজনক গন্তব্যে যাত্রা শুরু করছে সৌদি জোট।তারা মনে করছে,আধিপত্য বিস্তারের এ মাঠের লড়াইয়ে তারা লাভবান হবে।বরং তারা যে আশা করেছিল তার কিছুই পাবে না।  বরং তারা নিজেদেরকে নিজেদেরই আপন সীমানায় কোণঠাসা করার চেস্টা করছে,আর কাতার এই অবরোধকে বুমেরাং করে দিয়ে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতিতে দিন দিন অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। লেখক:শিক্ষার্থী,জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 

Check Also

শ্রীলংকায় মাদ্রাসা ও নারীদের বোরকা নিষিদ্ধের উদ্যোগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : এক হাজারেরও বেশি মাদ্রাসা ও নারীদের বোরকা পরিধান নিষিদ্ধের উদ্যোগ নিয়েছে শ্রীলংকার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *