এমসি কলেজে গণধর্ষণ: দুই নম্বর আসামি তারেক গ্রেপ্তার

সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনার মামলায় আরো একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলা থেকে গ্রেপ্তার তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক আহমদ (২৮) এই মামলার দুই নম্বর আসামি।

গ্রেপ্তারকৃত তারেক সুনামগঞ্জ পৌর শহরের উমেদনগরের রফিকুল ইসলামের ছেলে এবং সিলেট সদর উপজেলার মেজরটিলার দীপিকা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা। তারেককে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন র‌্যাব-৯ এর গণমাধ্যম শাখার কর্মকর্তা এএসপি ওবাইন রাখাইন।

র‌্যাব জানিয়েছে, এ নিয়ে ধর্ষণ মামলার এজাহারে নাম উল্লেখ করা ছয় আসামির সবাইকে গ্রেপ্তার করা হলো। এছাড়াও এ ঘটনায় জড়িত মামলার অজ্ঞাতনামা আসামি আরও দুই জনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

স্বামীকে নিয়ে ঘুরতে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় এমসি কলেজে গিয়েছিলেন এক নববধূ। এ সময় কলেজ ক্যাম্পাস থেকে পাঁচ থেকে ছয়জন তাদের জোরপূর্বক কলেজের ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়। সেখানে একটি কক্ষে স্বামীকে আটকে রেখে গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করেন তারা। পরের দিন শনিবার ওই গৃহবধূর স্বামী বাদী হয়ে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরো তিনজনকে আসামি করে মামলা করেন।

মামলায় আসামিরা হলো- সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার উমেদনগরের রফিকুল ইসলামের ছেলে তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮), হবিগঞ্জ সদরের বাগুনীপাড়ার মো. জাহাঙ্গীর মিয়ার ছেলে শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), জকিগঞ্জের আটগ্রামের কানু লস্করের ছেলে অর্জুন লস্কর (২৫), দিরাই উপজেলার বড়নগদীপুর (জগদল) গ্রামের রবিউল ইসলাম (২৫) ও কানাইঘাটের গাছবাড়ি গ্রামের মাহফুজুর রহমান মাসুমকে (২৫)। এই ছয়জনই ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবেই পরিচিত। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরো তিনজনকে আসামি করা হয়।

এ ঘটনায় সবশেষ মঙ্গলবার মাহবুবুর রহমান রনি, রাজন ও আইনুলের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সিলেট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দ্বিতীয় আদালতের বিচারক এম সাইফুর রহমান পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এদের মধ্যে রাজন ও আইনুল ছিলেন সন্দেহভাজন। পরে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

এ ছাড়া সোমবার মধ্যরাতে মামলার ৬ নম্বর আসামি মাহফুজুর রহমান মাসুমকে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ বলছে, ভারতে পালানোর চেষ্টা করছিলেন মাসুম। মামলার প্রধান আসামি সাইফুর রহমান, ৪ নম্বর আসামি অর্জুন লস্কর ও ৫ নম্বর আসামি রবিউলকে পাঁচ দিন করে রিমান্ড দিয়েছেন আদালত।

গত রোববার সকালে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা থেকে সাইফুর রহমান ও হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার মনতলা এলাকা থেকে অর্জুন লস্করকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেদিন রাতে এ মামলার আরো দুই আসামি শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি ও রবিউল ইসলামকে হবিগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। নবীগঞ্জ উপজেলার এক আত্মীয়র বাসা থেকে রবিউলকে গ্রেপ্তার করা হয়। অপরদিকে একই দিন দিবাগত রাতে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার কচুয়া নয়াটিলা এলাকা থেকে রাজনকে আটক করে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। তিনি এ মামলার অজ্ঞাতপরিচয় তিন আসামির একজন। রাজনকে আশ্রয় দেওয়া ও সহযোগিতা করায় আইনুলকে আটক করা হয়।

এমসি কলেজে গৃহবধূ সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় বিচারিক তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদেশে, সিলেটের নারী ও শিশু আদালতের বিচারকসহ তিনজনকে যৌথ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিটিকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলেছেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া সিলেটের পুলিশ কমিশনারকে তদন্তের সময় কমিটির সদস্যদের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে এবং তদন্তকাজে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সরঞ্জাম সরবরাহ করতে সিলেটের জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি একটি রিটের শুনানি শেষে হাইকোর্ট এমসি কলেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল ইস্যু করেছেন।

মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী এমসি কলেজের ঘটনাটি আদালতের নজরে এনে প্রয়োজনীয় আদেশের আবেদন জানালে বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মহি উদ্দিন শামীমের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

আদেশে শিক্ষা সচিব, আইন সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রেজিস্ট্রার, এমসি কলেজের অধ্যক্ষ, সিলেটের জেলা প্রশাসক, সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার, এমসি কলেজের হোস্টেল সুপারকে দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত ৩ সদস্যদের তদন্ত কমিটি মঙ্গলবার থেকেই কলেজ ক্যাম্পাসে এসে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে। এদিন বিকেল ৫টায় তদন্ত কমিটির সদস্যরা কলেজ ক্যাম্পাসে এসে প্রথমে অধ্যক্ষ সালেহ আহমদের সাথে বৈঠক করেন। এরপর তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

তদন্ত কমিটির সদস্যরা হলেন- মাউশি পরিচালক (প্রশাসন) শহিদুল কবির চৌধুরী, মাউশি সহ-পরিচালক লোকমান হোসেন, মাউশি উপ-পরিচালক নুরে আলম।

কলেজ কর্তৃপক্ষ গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যদের সাথেও তারা বৈঠক করেন। এদিকে, ধর্ষণকান্ডের পর এমসি কলেজ কর্তৃপক্ষ গঠিত তদন্ত কমিটিও কাজ শুরু করেছে বলে জানান এ কমিটির এবং প্রধান কলেজের গণিত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আনোয়ারুজ্জামান।

তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করছি। আশা করছি নির্ধারিত সাত দিনের মধ্যেই প্রতিবেদন দিতে পারবো।

Check Also

কাঠগড়ায় মোবাইল ফোনে কথা বলেছেন ওসি প্রদীপ

চাঞ্চল্যকর ও আলোচিত মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যা মামলার শুনানির সময়, কাঠগড়ায় মোবাইল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *