সেই রাতে তিন্নীর সঙ্গে যা ঘটেছিল

বোনের সাবেক স্বামীর হাতে লাঞ্চিত হওয়ার পর মায়ের সঙ্গে শেষ কথা ছিল, ‘বাইরের লোক কেন আসবে আমার রুমে? আমারতো সব শেষ, বেঁচে থেকে কী লাভ?’ এরপর রাত ১২টার দিকে ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার হয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য স্নাতোকোত্তর উলফাত আরা তিন্নীর। ওই রাতে তিন্নীর সঙ্গে যা ঘটে, তা উঠে এসেছে তার মা ও বোনের কথায়। শনিবার সেসব কথা জানান তারা।

ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার শেখপাড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মৃত ইউসুফ আলীর মেয়ে তিন্নী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী ছিলেন।

নিহত তিন্নির পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তিন্নিরা তিন বোন। তার বাবা মৃত ইউসুফ মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার শৈলকূপা থানাধীন যোগীপাড়া গ্রামের তাদের স্থায়ী নিবাস। তবে মাসহ তারা দুই বোন থাকতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী শেখপাড়া বাজার সংলগ্ন নিজস্ব দোতলা বাসায়। বড় বোনের আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। তিন বোনের মধ্যে তিন্নি ছিলেন ছোট। মেঝ বোনের বিয়ে হয়েছিল তাদের এক কাজিন জামিরুলের সঙ্গে। তবে বিভিন্ন কারণে সে বিয়ে টেকেনি।

বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে শৈলকুপার শেখপাড়া গ্রামে নিজের ঘর থেকেই তিন্নীর মরদেহ উদ্ধার হয়। মা হালিমা বেগম বলেন, ‘বৃহম্পতিবার তিন্নী এক বান্ধবীর বিয়ের অনুষ্ঠানে কুষ্টিয়া গিয়েছিল। অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরে রাত ৮টার দিকে। এর কিছু সময় পর মেজো মেয়ে মিন্নীর তালাকপ্রাপ্ত স্বামী জামিরুল গোপনে তিন্নীর রুমে ঢোকে এবং খাটের নিচে লুকিয়ে থাকে। তিন্নী বাইরে থেকে এসে পোশাক বদল করে বাসার নিচ তলায় তার সঙ্গে দেখা করে, একটু বসে। এরপর ঘুমাতে তার রুমে যায়।’

তিন্নীর মা ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আরো বলেন, ‘এরপর তিন্নী বুঝতে পারে তার খাটের নিচে কেউ লুকিয়ে আছে। লোকটি খাটের নিচ থেকে বের হয়ে এক পর্যায়ে তিন্নীকে জাপটে ধরে। শুরু হয় ধস্তাধস্তি, এসময় চিৎকার দেয় তিন্নী। লোকটি ছিল জামিরুল।’

হালিমা বেগম বলেন, ‘আমরা তখন বুঝতে পারি বাসার চারপাশে জামিরুলের অনেক সহযোগী এবং তারা আমাদের বলতে থাকে- কোনও হৈ চৈ করবি না। আজ সবাইকে মেরে ফেলবো।’

এর পরের ঘটনার বর্ণনা দেন তিন্নীর মেজো বোন মিন্নী। তিনি জানান, বোনের চিৎকারে তিনি ছুটে যান তিন্নীর রুমের সামনে। কিন্তু রুম ছিল ভেতর থেকে আটকানো। মিন্নী বলেন, ’অনেক চেষ্টা করে দরজার লক ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখি সেখানে জামিরুল। তখনো তারা ধস্তাধস্তি করছে। বাধা দিতে গেলে সে আমাকে মারতে আসে। আমি অন্য রুমে গিয়ে আত্মরক্ষা করি। এরপর অনেক সময় চলে তিন্নীর রুমে তাণ্ডব। পরে রুম থেকে বের হয়ে আমাকে ও আমার মাকে খুঁজতে থাকে সে। এক পর্যায়ে প্রতিবেশীদের উপস্থিতি টের পেয়ে রাত ১১টার দিকে জামিরুল পালিয়ে যায়।’

মা হালিমা বেগম জানান, ‘জামিরুল বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার পর তিন্নী নিচে তার রুমে আসে। আমাকে সে প্রশ্ন করে- বাইরের লোক কেন আমার রুমে প্রবেশ করল মা? আমার তো সব শেষ! আমার আর বেঁচে থেকে কী লাভ? এই বলে সে নিজের রুমে চলে যায়। এরপর পর রাত ১২টার দিকে টের পাই তিন্নী রুমে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে’- বলেন মা হালিমা বেগম।’

এক প্রশ্নের জবাবে মিন্নী জানান, জামিরুল যখন তার স্বামী ছিলেন তখন এই বাড়িতে এলে ওই রুমেই থাকতেন এবং জামিরুল হয়তো ভেবেছিলেন এখনও তিনি (মিন্নী) ওই রুমেই থাকেন।

মিন্নী বলেন, ‘আমাকে তুলে নিতে বা মেরে ফেলতে সে এ রুমে লুকিয়ে ছিল। তালাকের পর সে বিশ্বাস করেনি- আমার আবার বিয়ে হয়েছে। সে আমাকে ফিরিয়ে নিতে চেষ্টা চালাতে থাকে। আমার কাছ থেকে মেয়েকে সে জোর করে তার কাছে নিয়ে যায়। এ নিয়ে কয়েকবার তিন্নীর সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়।’

তিন্নীদের ভাই না থাকায় চাকরি পেয়ে পরিবারের হাল ধরতে চেয়েছিলেন তিন্নী। কাঁদতে কাঁদতে তিন্নীর মা বলেন, ‘আমি আর কী নিয়ে থাকবো। অনেক চেষ্টা করেছি তাকে বিয়ে দিতে। কিন্তু সে কোনো সময় রাজি হয়নি। শুধু বলতো, মা দোয়া করো আমি চাকরি পেয়ে সংসারের যেন হাল ধরতে পারি।’

সূত্র জানায়, সম্প্রতি জামিরুল আবারও তিন্নির মেঝ বোনকে ঘরে তুলতে চায়। তবে এ বিষয়ে তিন্নিদের আপত্তি থাকায় উভয়পক্ষে কথা কাটাকাটি হয়। ঘটনার দিন সন্ধ্যার দিকেও জামিরুল ও তার অন্য সঙ্গীরা এসে তাদের বাসায় হামলা চালায়। এর দু’ঘণ্টা পর জামিরুল আবারও ওই বাসায় আসে এবং তিন্নি বোন ও মাকে নিচের ঘরে আটকে রেখে দোতলায় তিন্নির ঘরে ঢোকে। সেখানে আপত্তিকর আচরণ করার পর জামিরুল চলে যায়। এরপর থেকেই ঘরের দরজা বন্ধ ছিল তিন্নির।

তিন্নীর স্বজনদের অভিযোগ, তার বোনের সাবেক স্বামী শেখপাড়া গ্রামের কুনুরুদ্দীনের ছেলে জামিরুল ও তার তিন সহযোগী জোর করে তিন্নীদের বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর চালায়। এসময় তিন্নীর শোবার ঘরে ঢুকে তার শ্লীলতাহানি করায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি। ঘরে ঢুকে নির্যাতন ও তার রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় শৈলকুপা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে তার মায়ের দায়ের করা মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার রাতে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তবে এ ঘটনায় মূল অভিযুক্ত জামিরুল পলাতক রয়েছে বলে জানা গেছে। আটককৃতরা হলো- শেখপাড়া এলাকার কনুর উদ্দিনের ছেলে আমিরুল, নজরুল, লাবিব ও তন্ময়।

শৈলকুপা থানার ওসি (তদন্ত) মহসিন হোসেন জানান, ‘রাত সাড়ে বারোটার দিকে ফোন দিয়ে ঘটনাটি জানায় তার পরিবার। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই পরিবারের সদস্যরা ভিক্টিমকে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে রাত দুইটার দিকে তার মৃত্যুর খবর জানতে পারি আমরা। নিহতের ময়না তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। মৃত্যুটি পরিকল্পিত হত্যা নাকি আত্মহত্যা ময়না তদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে বিষয়টি খোলা হবে। এর আগে কিছু বলা যাচ্ছে না।’

তিন্নির মৃত্যুর ঘটনা শুনে শুক্রবার ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. পরেশ চন্দ্র বর্ম্মন। এসময় তিনি সেখানে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিষয়টি অধিকতর তদন্তের দাবি জানান।

Check Also

যেভাবে এলো শ্রমিক দিবস

‘শ্রমিক-মালিক নির্বিশেষ, মুজিববর্ষে গড়বো দেশ’ এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সারা দেশে আজ পালিত হবে মহান …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *