ধর্ম, যুগে যুগে ঈদে মীলাদুন্নবী উৎসব পালিত

যুগে যুগে ঈদে মীলাদুন্নবী উৎসব পালিত ।
বেলাল হোসেন রৌমারী

নবী  করীম(সাঃ)  নবুয়ত  পরবর্তীকালে
নিজেই  সাহাবীদেরকে নিয়ে  নিজের মিলাদ   পড়েছেন  এবং  নিজ জীবনী আলোচনা করেছেন। যেমন- হযরত ইরবায ইবনে ছারিয়া  একদিন নবী করীম (সাঃ)-কে তাঁর আদি   বৃত্তান্ত  বর্ণনা করার জন্য আরয করলে  নবী করীম(সাঃ) এরশাদ  করেন আমি  তখনও  নবী  ছিলাম, যখন  আদম (আঃ)এর  দেহের  উপাদান  মাটি  ও পানি পৃথক  পৃথক  অবস্থায়  ছিল।  অর্থাৎ    আদম   সৃষ্টির  পূর্বেই আমি    নবী   হিসেবে     মনোনীত   ছিলাম।   আমাকে   হযরত ইবরাহীম দোয়া   করে তাঁর   বংশে এনেছেন সুতরাং  আমি   তাঁর  দোয়ার   ফসল।  হযরত   ঈসা  তাঁর উম্মতের নিকট  আমার আগমনের    সুসংবাদ দিয়েছিলেন। তারা   উভয়েই আমার  সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত ছিলেন। আমার মা বিবি আমেনা আমার প্রসবকালীন সময়ে যে  নূর তাঁর গর্ভ  হতে  প্রকাশ  পেয়ে সুদূর  সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ আলোকিত করতে দেখেছিলেন,আমিই সেই নূর(মিশকাত শরীফ)।

নবী করীম(সাঃ) কে   তার এক  সাহাবী      জিজ্ঞাসা  করেছিলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ)  প্রতি   সোমবার  আপনার  রোযা  রাখার  কারণ  কী হুযুর  (সাঃ)বললেন এই      দিনে    আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনেই (সোমবার ২৭শে রমযান) আমার উপর কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে।(সহীহ মুসলিম)।

এভাবে  হযরত  আবু  বকর, হযরত  ওমর, হযরত  ওসমান, হযরত আলী  চার জন খলিফা নিজ  নিজ  খেলাফতযুগেও পবিত্র বেলাদত শরীফ উপলক্ষে  মিলাদ  মাহফিল করতেন এবং মিলাদের ফযিলত বর্ণনা করতেন বলে  মক্কা   শরীফের   তৎকালীন  (৯৭৪)    বিজ্ঞ  মুজতাহিদ আলেম  আল্লামা  ইবনে হাজার হায়তামী স্বীয় রচিত আন-নি’মাতুল কোবরা আলাল আলম গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও       অন্যান্য        সাহাবীগণ   নবীজীর  জীবদ্দশায় মীলাদুন্নবী মাহফিল করতেন।

হযরত  ইবনে  আব্বাস  কর্তৃক  মিলাদ  মাহফিলঃ
একদিন হযরত  আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস(রাঃ) নিজ গৃহে  মিলাদ  মাহফিল  অনুষ্ঠানে  বক্তব্য  রাখছিলেন। তিনি  উপস্থিত  সাহাবাগণের  নিকট  নবী  করীম(সাঃ)এর  পবিত্র  বেলাদত  সম্পর্কিত  ঘটনাবলী  বয়ান    করছিলেন। শ্রোতা মণ্ডলী শুনতে শুনতে মীলাদুন্নবীর আনন্দ উপভোগ করছিলেন   এবং  আল্লাহর  প্রশংসা ও  নবীজীর  দরূদ পড়ছিলেন।  এমন   সময় হুজুর(সাঃ)   সেখানে উপস্থিত হয়ে এরশাদ করলেন তোমাদের সকলের প্রতি আমার  সুপারিশ ও   শাফাআত   অবধারিত   হয়ে  গেল। (আদ দুররুল মুনাযযাম)।

হযরত আবু আমের আনসারীর মিলাদ মাহফিলঃ
হযরত  আবু     দারদা  হতে   বর্ণিত    আছে- তিনি   বলেন,  আমি  একদিন  নবী  করীম র  সাথে মদীনাবাসী  আবু  আমের এর   গৃহে  গমন করে দেখতে পেলাম তিনি  তার        সন্তানাদি ও আত্মীয়-স্বজনকে   একত্রিত    করে   নবী   করীম (সাঃ)এঁর পবিত্র  বেলাদত    সম্পর্কিত   জন্ম   বিবরণী   শিক্ষা  দিচ্ছেন এবং বলছেন যে,আজ সেই পবিত্র  জন্ম তারিখ। এই মাহফিল দেখে নবী-করীম(সাঃ) খুশী হয়ে তাকে সুসংবাদ দিলেন নিশ্চয়ই        আল্লাহ  তায়ালা তোমার  জন্য মীলাদের      কারণে রহমতের  অসংখ্য  দরজা  খুলে দিয়েছেন  এবং   ফেরেশতাগণ  তোমাদের   সকলের    জন্য  মাগফিরাত     কামনা     করছেন (আল্লামা      জালালুদ্দীন সুয়ুতির     সাবিলূল  হুদা ও  আল্লামা     ইবনে     দাহ্ইয়ার  আত-তানভীর-৬০৪ হিঃ)।

 হে   মুসলমানগণ  আপনারা  জেনে  রাখুন  যে, মীলাদুন্নবী (সাঃ)এর  আলোচনা   ও   তাঁর  সমস্ত  শান-মান বর্ণনা   করা এবং    ঐ    মাহফিলে  উপস্থিত  হওয়া  সবই সুন্নাত।     বর্ণিত   আছে   যে,হযরত   হাসসান   বিন    সাবিত কিয়াম অবস্থায় রাসুলুল্লাহ(সাঃ)-এর পক্ষে হুযুরের উপস্থিতিতে   হুযুর(সাঃ)এর    গৌরবগাথা   পেশ  করতেন,আর  অন্য অন্য সাহাবীগণ  তা  শুনার     জন্য  একত্রিত  হতেন। (ফতোয়ায়ে  ,হারামাঈন)।

হযরত আব্বাস (রাঃ)নূর নবী(সাঃ)এর জন্ম প্রসঙ্গে ৯ম হিজরীতে একটি কবিতায় বলেছেন। হে  প্রিয়  রাসূল,আপনি   যখন   ভূমিষ্ঠ  হন,তখন পৃথিবী   উদ্ভাসিত  হয়ে    উঠেছিল এবং আপনার   নূরের  ছটায়   চতুর্দিক  আলোময় হয়ে গিয়েছিল(নশরুত ত্বীব,মাওয়াহিব,বেদায়া ও নেহায়া)।

   আল্লাহ  পাক কোরআন  মাজীদে নির্দেশ    করেছেন  নেয়ামত পেয়ে খুশী ও  আনন্দ  করার  জন্য।    যেমন কোরআনে আছে হে    নবী আপনি এ কথা ঘোষনা করে  দিন, মুসলমানগণ  খোদার  ফযল  ও   রহমত  পাওয়ার   কারণে   যেন    নির্মল   খুশি   ও   আনন্দোৎসব     করে।    এটা     তাদের যাবতীয় সঞ্চিত সম্পদ থেকে উত্তম।”
(সূরা ইউনুস, আয়াত নং ৫৮)

আল্লাহ তায়ালা  কোরআন মাজীদে সূরা ইউনুসের ৫৮ নং আয়াতে মীলাদুন্নবী উপলক্ষ্যে  প্রতি বৎসর ঈদ ও  পবিত্র আনন্দানুষ্ঠান     পালনের     কথা     উল্লেখ     করেছেন।     সূরা  বাক্বারাতে    মূসা ও    বনী    ঈসরাইলগণের নীলনদ    পার    হওয়া     এবং    প্রতি     বৎসর    এ     উপলক্ষ্যে আশুরার  রোযা   ও   ঈদ  পালন   করা  এবং  সূরা  মায়েদায় ঈসা ও   বনী    ঈসরাইলের    হাওয়ারীগণের  জন্য    আকাশ    থেকে     আল্লাহ    কর্তৃক    যিয়াফত   হিসেবে মায়েদা অবতীর্ণ  হওয়া উপলক্ষ্যে প্রতি বৎসর   ঐ দিনকে ঈদের দিন হিসেবে পালন   করার কথা  কোরআনে উল্লেখ আছে (সূরা মায়িদা ১১৪)।

ইন্তেকাল দিবস পালন হয় না কেন
আরেকটি   বিষয়    প্রশ্ন    সাপেক্ষ! তা হচ্ছে,    নবী    করীম(সাঃ)এর শুধু জন্মতারিখ পালন করা হয় কেন, ইন্তেকাল তো  একই    তারিখে  এবং  একই   দিনে  হয়েছিল?  সুতরাং একসাথে জন্ম  ও মৃত্যু দিবস  পালন করাইতো যুক্তিযুক্ত।  যেমন অন্যান্য মহামানব  ও ওলী-গাউসদের  বেলায়   মৃত্যু দিবসে ওরস পালন করা হয়ে থাকে।

মোটকথা আল্লাহ  পাক  হুযুর (সাঃ)এর     আবির্ভাব উপলক্ষ্যে   আনন্দোৎসব  করার   নির্দেশ    করেছেন।  কিন্তু ইন্তেকাল  উপলক্ষ্যে  শোক  পালন  করতে বলেন নি। তাই আমরা আল্লাহর নির্দেশ মানি।

দ্বিতীয় উত্তর-  নবী  করীম(সাঃ) নিজে  সোমবারের রোযা  রাখার কারণ হিসেবে  তাঁর পবিত্র বেলাদাত ও প্রথম  ওহী  নাযিলের   কথা    উল্লেখ  করেছেন।  কিন্তু     দুনিয়া থেকে  বিদায় গ্রহণ  বা ইন্তেকাল   উপলক্ষ্যে শোক পালন   করার কথা   উল্লেখ করেন  নি।  যদি করতেন,তাহলে আমরা তা পালন করতাম। সুতরাং একই দিনে ও একই তারিখে নবী করীম(সাঃ)এর   জন্ম  এবং  ইন্তেকাল   হলেও  মৃত্যুদিবস  পালন করা যাবে না। এটাই কোরআন-হাদীসের শিক্ষা।

তৃতীয়  উত্তর- নবী  করীম (সাঃ)তো  স্বশরীরে  হায়াতুন্নবী। হায়াতুন্নবীর   আবার  মৃত্যুদিবস হয় কী করে? মৃত ব্যক্তির জানাজা   হয়,   নবীজীর  কি  জানাজা    হয়েছিলো?   তিনি নিজে   জানাজা  না  করে     দরূদ     পড়তে     আদেশ    দিয়ে গেলেন কেন? কেউ কি জীবিত পিতার মৃত্যুদিবস পালন  করে?  আসলে ওরা  কোনটাই  পালনের     পক্ষে  নয়।  শুধু ঈদে  মীলাদুন্নবী  (সাঃ) পালনকারীদেরকে   ঘায়েল  করার  লক্ষ্যেই      এইসব   কূটতর্কের    অবতারণা    করে থাকে।       আমরা কোরআন নাযিলের  আনন্দোৎসব করি শবে  ক্বদরে  এবং   নবীজী’র আগমনের    আনন্দোৎসব  পালন  করি ১২ ই  রবিউল আউয়ালে।    ওরা  কোনটাই     পালনের     পক্ষপাতী  নয়। আমরা  সূরা    ইউনুসের  ৫৮  নং আয়াতের   নির্দেশ  পালন করি।

Check Also

বাহুবলে অভিবক্ত ভারত শাসন আমলে নির্মিত জামে মসজিদ তৃতীয় বারের মতো নির্মান ———————–

কাউছার মাহদী হবিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধিঃ- বাহুবল উপজেলার সর্বপ্রথম নির্মিত জামে মসজিদ ২ নং পুটিজুরী ইউনিয়নের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *