রণাঙ্গনের সাহসী সৈনিক এম.এ মজিদ (কমাণ্ডার মজিদ)। একজন ত্যাগী বীর মুক্তিযোদ্ধার সাথে কথোপকথন।

– – – সাফাত বিন ছানাউল্লাহ্
এই দেশ বহু ত্যাগ, রক্ত দিয়ে কেনা। পাকিস্তানি বর্বর শাসকগোষ্ঠী যখন পূর্ব বাংলার জনগণের অধিকার ছিনিয়ে নেয়ার পায়তারা করছিল ঠিক তখন জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে বাংলার অকুতোভয় সন্তানেরা অস্ত্র হাতে নিয়েছিল দেশকে রক্ষার জন্য যারা জীবনের মায়া, পরিবারের মায়া ভুলে যুদ্ধ করে এই দেশকে স্বাধীন করেছিল তাদের বলা হয় মুক্তিযোদ্ধা। ওরা এই দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান। জাতী পৃথিবী যতদিন থাকবে ততদিন তাদের শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে।
তেমনি একজন রণাঙ্গনের বীর যোদ্ধা ইতিহাসখ্যাত চট্টগ্রামের সূর্যসন্তান এম এ মজিদ (কমাণ্ডার মজিদ)। যার বাড়ি দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ থানার বৈলতলী গ্রামে। তিনি আজ বয়সের ভারে নুহ্য, শরীরে বাসা বেধেছে বিভিন্ন রোগ, ওপেন হার্ট সার্জারি করার পর কোথাও তেমন একটা যাননা। তবুও আমাকে কাছে পেয়ে স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে বলেন – ঐতিহাসিক ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা ” এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” শুনার পর আমরা যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করি।
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার রফিকুল ইসলাম আমাকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ (তখনও পটিয়া) অঞ্চলের ১নং সেক্টরের গ্রুপ কমাণ্ডার নিযুক্ত করেন। আমার অধীনে ২২ জন মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং নেয় এবং বিভিন্ন জায়গার অপারেশন পরিচালনা করে। আমাদের বৈলতলীতে ৩টি রাজাকার ক্যাম্প ও ২ টি মুজাহিদ ক্যাম্প ছিল। সাতবাড়ীয়া, বৈলতলী, বরকল মিলে রাজাকার প্রধানদের মধ্যে বৈলতলীর সাবেক চেয়ারম্যান আহমদ সৈয়দ, একই এলাকার শফি, হেফাজত আলী সহ আরো অনেকে পাকবাহিনীদের সাথে মিলে ভয়ঙ্কর হত্যাযজ্ঞে মেতে উটে। আল্লাহর রহমতে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধের মাধ্যমে এদেরকে প্রতিহত করতে সক্ষম হই।
তিনি বলেন, পাঞ্জাবিরা আমার বাড়ি একেবারে জালিয়ে ছারখার করে দিয়েছিল। আমার পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ কাগজ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, বঙ্গবন্ধুর সাথে মূল্যবান ছবি সহ সবকিছু একটি বস্তায় ভরে আমার বাড়ী থেকে কিছুদূরে আমার বোনের শাশুরবাড়ীতে রেখে এসেছিলাম। হায়েনার দল খবর পেয়ে ওখানে আক্রমন করলে আমার বোন পুকুরে ইটা দিয়ে বেধে বস্তাটা চুবিয়ে দেয়। এভাবে সব গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট শেষ হয়ে যায় যেগুলো কখনও পাবনা! এম এ মজিদ বৈলতলী ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক অর্থ সম্পাদক ও দুই বারের সদস্য। তার রাজনৈতিক গুরু কে? জানতে চাইলে বলেন : চন্দনাইশের আরেক কৃতি সন্তান, বড়মা নিবাসী, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংঘটক, বঙ্গবন্ধুর স্নেহভাজন, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও কৃষকলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মরহুম একে এম আব্দুল মান্নান।
বঙ্গবন্ধুর সাথে স্মৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন – একবার বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামে সমাবেশ উপলক্ষে সফরে এলে এম. এ আজিজের বাসায় উটেন। বাসার ভেতরে সহ বাইরে হাজার হাজার নেতাকর্মীর ভীড়, দুপুরের খাবারের পর চট্টগ্রামের নেতৃবৃন্দ যখন বঙ্গবন্ধুর সাথে ফটো তোলার জন্য ব্যস্ত তখন আমিও সবার সাথে লাইনে দাড়াই। বঙ্গবন্ধু তখন হটাৎ আমার দিকে ফিরে এম এ আজিজকে বললেন, এটা কে? এম এ আজিজের উত্তর ছেলেটি আপনার খুব ভক্ত, তখন মহৎপ্রাণ মানুষটি আমাকে কাছে ডেকে ছবি তুলেন। কিন্তু, দুর্ভাগ্য মুক্তিযুদ্ধের সময় সবকিছু শেষ হয়ে যায়। বর্তমান রাজনীতি নিয়ে মজিদ কমাণ্ডার বলেন – বর্তমান রাজনীতি আর আমাদের রাজনীতি আকাশ পাতাল তফাত। এখন চলছে টাকার খেলা, টাকার জোরে অনেকেই আজ মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাচ্ছে, যাদের জন্মই হয়নি যুদ্ধের সময়।
আমার নানাভাই বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী মরহুম মিয়া ফারুকীর সাথে মজিদ কমান্ডারের ছিল গভীর সম্পর্ক। নানা বেচে থাকা অবস্থায় প্রায় তিনি পটিয়া ফারুকী পাড়ায় যেতেন। স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন – চট্টগ্রাম আন্দরকিল্লায় মিয়া ফারুকীর বিখ্যাত “চট্টল লাইব্রেরী” ছিল আওয়ামীগের অঘোষিত কার্যালয়। সেখানে জহুর আহমদ চৌধুরী, এম এ আজিজ সহ নেতাকর্মীদের মিলনস্থল হত প্রতিদিনই। সেখান থেকেই যে কোন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হত। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম রূপকার কমাণ্ডার মজিদ আজ বয়সের কাছে পরাস্ত। ডায়াবেটিস সহ নানা রোগ বাসা বেধেছে শরীরে। তারা যেন আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে না যায়,  যেন স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসের পাতায় থাকে আজীবন।

Check Also

নড়াইলে করোনায় মৃত্যু ৪, শনাক্তের হার ৩৬.২৮ শতাংশ

উজ্জ্বল যায়, জেলা প্রতিনিধি, নড়াইল: গত ২৪ ঘন্টায় নড়াইলে ১১৩ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৪১ জন করোনা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *