কথা রাখেনি পাকিস্তান

ঢাকা : স্বাধীনতার ৫০ বছরে পদার্পণ করছে বাংলাদেশ। কিন্তু পাকিস্তান এখনো বাংলাদেশের করা তিন দাবির কোনোটাই পূরণ করেনি। কবে করবে কিংবা আদৌ করবে কিনা তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। স্বাধীনতার পর পরই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৭১ সালে হানাদার বাহিনীর নৃশংসতর জন্য পাকিস্তানের নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা, সম্পদের সমবণ্টন এবং আটকেপড়া পাকিস্তানিদের প্রত্যাবাসন।

পাকিস্তানের অনাগ্রহের কারণে এ বিষয়গুলোর এখনো কোনো সুরাহা হয়নি। বাংলাদেশ বিভিন্ন বৈঠকে বাবার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করলেও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কখনো কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর ৫০ বছর পরও ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান এ নিয়ে বরাবরই উদাসীন। ১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় এক চুক্তিতে পাকিস্তান ক্ষমা প্রার্থনা করবে এমন একটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও দেশটির কোনো সরকারই পরবর্তীতে সেটা মানেনি।

১৯৭৪ সালের এপ্রিলে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি এবং পাকিস্তান সরকারের গঠিত হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট পর্যালোচনা করলেও ক্ষমার বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের ত্রিপক্ষীয় চুক্তির ১৩ নাম্বার ধারায় বলা হয়েছে-পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের সরকারের পক্ষ থেকে যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তার জন্য নিন্দা ও গভীর দুঃখ প্রকাশ করবে। ১৪ নাম্বার ধারায় বলা হয়েছে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এসে অতীতের ভুলের জন্য বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন।

চুক্তিটি স্বাক্ষর হওয়ার দুই মাস পর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো বাংলাদেশ সফরে এলেও তার দেশের সেনাদের ধ্বংসযজ্ঞের দায় নেননি এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনাও করেননি। পরবর্তীতে পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফ বাংলাদেশে সফরকালে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন করেন এবং ওই সময়ের পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশের জনগণের কাছে হতাশা ব্যক্ত করেন এবং বলেছিলেন তিনি পাকিস্তানি ভাই ও বোনদের পক্ষ হয়ে কথা বলছেন।

পাকিস্তান সরকারের গঠিত হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট সম্পূর্ণ অংশ প্রকাশ করা না হলেও যতটুকু হয়েছে তাতে ক্ষমা চাওয়া ও বিচারের বিষয়টি উল্লেখ আছে। তবে ক্ষমা না চাওয়ার বিষয়টি তাদের সরকারি নীতির অংশ। এজন্য এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে পাকিস্তানি দৈনিকগুলোতেও কোনো বাণী প্রকাশ করতে দেয়নি দেশটির বিগত ও বর্তমান সরকার।

১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী সাইক্লোনের পর তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের মানুষদের সহায়তার জন্য ২০ কোটি ডলার আন্তর্জাতিক সহায়তা দেওয়া হয়। এর পুরোটা এখানকার জনগণের জন্য হলেও বাংলাদেশকে কোনো টাকা দেয়নি পাকিস্তান। এছাড়া ৪৩২ কোটি ডলার সমমূল্যের সম্পদ চিহ্নিত করা হয়-যা দুই দেশের মধ্যে ভাগাভাগি হওয়ার কথা। এসব বিষয়েও এখন পর্যন্ত পাকিস্তান কোনো সাড়া দেয়নি। পাকিস্তান আমলে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয় আসতো পাট থেকে, যার পুরোটাই বাংলাদেশে উৎপাদিত হতো। কিন্তু এর সব টাকাই ব্যয় হতো পাকিস্তানের উন্নয়নে। তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে কোনো টাকাই আসতো না।

সম্পদ বণ্টনের বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে একাধিকবার আলোচনা হলেও কখনো কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি পাকিস্তান। ১৯৯৭ সালে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনার সময় পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয় বাংলাদেশের এ দাবি বন্ধুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করবে না দেশটি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সম্পদ বণ্টনের জন্য চারটি পদ্ধতির কথা বলা হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৭১ সালে জনসংখ্যার অনুপাত; সমতার অনুপাত; মোট বৈদেশিক সম্পদে কার অবদান কতটুকু এবং দুই দেশের সম্পদের অনুপাত। কিন্তু পাকিস্তান সবসময় এসব বিষয়ে উদাসীন।

স্বাধীনতালাভের পর বাংলাদেশে আটকেপড়া অনেক অবাঙালি পাকিস্তানে ফেরত যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। ওই সময় রেডক্রসের জরিপে বলা হয়, ৫ লাখ ৪০ হাজার মানুষ পাকিস্তানে যেতে চাই। পরে সেসব মানুষকে ১৩টি জেলায় ৭০টি ক্যাম্পে রাখা হয়। বর্তমানে ক্যাম্প সংখ্যা ৬৬।

১৯৭৩ এবং ১৯৭৪ সালের দুটি চুক্তিতে বাংলাদেশে অবস্থিত পাকিস্তানি এবং পাকিস্তানে অবস্থিত বাংলাদেশিদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি পরিষ্কার বলা হয়েছে। পাকিস্তান প্রাথমিকভাবে ১ লাখ ৪৮ হাজার জনকে ফেরত নেওয়ায় সম্মতি দিলেও নিয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার। এ লোকগুলো ফেরত যাওয়ার পর পাকিস্তানি দাবি করা শুরু করে চুক্তিতে যে পরিমাণ লোকের উল্লেখ আছে তার চেয়ে বেশি লোক তারা নিয়েছে। পাকিস্তানের এমন অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে আটকেপড়া চার লাখ পাকিস্তানির ফেরত যাওয়ার বিষয়টি ঝুলে রয়েছে।

Check Also

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে রাজারবাগ দরবার শরীফের বিবৃতি

সম্প্রতি সিআইডির একটি কথিত তদন্ত প্রতিবেদন এবং কয়েকটি মানববন্ধনকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমে রাজারবাগ দরবার শরীফের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *