বেড়ে গেল এলপিজির দাম

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজারজাত করা তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) মূল্য বেড়েছে। বছরের শুরুতেই দাম বাড়িয়েছে প্রায় সব প্রতিষ্ঠান। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির কাঁচামালের দাম ১৫-২২ শতাংশ বেড়ে গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গ্রাহক পর্যায়ে পণ্যটির দাম বাড়াতে হয়েছে। অন্যদিকে এলপিজির আকস্মিক এ মূল্যবৃদ্ধির ফলে ভোগান্তিতে পড়ার শঙ্কার কথা জানিয়েছেন সীমিত আয়ের সাধারণ ভোক্তারা।

কভিড-১৯ মহামারী পরিস্থিতির শুরুর দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম ব্যাপক হারে হ্রাস পায়। গত বছরের এপ্রিলে পণ্য দুটির দাম টনপ্রতি আড়াইশ ডলারে নেমে গিয়েছিল। পণ্যটির দামের এ নিম্নমুখিতার প্রভাব পরবর্তী সময়ে পড়ে দেশের বাজারেও। ওই সময় দেশেও গ্রাহক পর্যায়ে পণ্যটির দাম কমিয়েছিলেন আমদানিকারকরা। তবে এখন আবারো গ্রাহক পর্যায়ে পণ্যটির দাম বাড়িয়েছেন তারা। কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির কাঁচামাল বিউটেন ও প্রোপেনের দাম গত বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় যথাক্রমে ১৫ ও ২২ শতাংশ বেড়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় বাজারেও পণ্যটির দাম বাড়ানো হয়েছে।

জ্বালানি তেল পরিশোধনের সময় উপজাত হিসেবে পাওয়া বিউটেন ও প্রোপেনের সংমিশ্রণে তৈরি করা হয় এলপিজি। গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর সময়ে এলপিজির কাঁচামাল দুটির দাম বেড়েছে টনপ্রতি গড়ে ৩২০ ডলার। সৌদি আরামকোর কোম্পানি প্রাইসিং (সিপি) তালিকার তথ্য বলছে, গত বছরের ডিসেম্বরে প্রতি টন প্রোপেনের দাম ছিল ৪৫০ ডলার, যা চলতি মাসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫০ ডলারে। আর ওই সময় প্রতি টন বিউটেনের দাম ছিল ৪৬০ ডলার। জানুয়ারিতে বিউটেনের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৩০ ডলার।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সভাপতি আজম জে চৌধুরী বলেন, এলপিজির বাজার ওঠানামায় দেশেও দাম বাড়ানো-কমানো হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় অন্য দেশগুলোর তুলনায় সবচেয়ে কম মূল্যে গ্রাহকের কাছে এলপি গ্যাস সরবরাহ করছে বাংলাদেশের এলপিজি অপারেটররা।

এলপি গ্যাসের পরিবেশকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মাসের শুরুতে সব কোম্পানির ১২ কেজি সিলিন্ডারের গড় মূল্য বেড়েছে ১০০ টাকা করে। ডিসেম্বরে বসুন্ধরা এলপি গ্যাসের ১২ কেজির সিলিন্ডার গ্রাহক পর্যায়ে বিক্রি হয়েছে প্রতিটি ৮০০-৮২০ টাকায়, যা এখন ৮৮০-৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সম ওজনের বেক্সিমকো এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার ডিসেম্বরে বিক্রি হয়েছে ৮৩০ টাকা করে। বর্তমানে এটি বিক্রি হচ্ছে ৯২০ টাকায়। ডিসেম্বরে যমুনা এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার ৮২০-৮৪০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০০-৯৪০ টাকায়। এছাড়া পেট্রোম্যাক্সের প্রতি সিলিন্ডার গ্যাস ৮২০ টাকা থেকে বেড়ে ৯৩০ টাকা, টোটাল এলপিজি ৮৫০ থেকে ৯২০-৯৫০ ও জি-গ্যাসের প্রতি সিলিন্ডার এলপিজি ৭৮০ টাকা থেকে বেড়ে ৯০০-৯২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর বাইরে অন্যান্য কোম্পানির বাজারজাত করা এলপি গ্যাসের মূল্যও একই হারে বেড়েছে।

এলপিজির দাম বাড়ায় ক্ষুব্ধ সাধারণ গ্রাহকরা। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহারকারী আসলাম আলী জানান, এলপিজির মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম হুট করে বাড়িয়ে দেয়া হলে তা সাংসারিক ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এদিকে বেসরকারি এলপিজির দাম এমন সময়ে বাড়ানো হলো যখন পণ্যটির দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। চলতি মাসের ১৪ জানুয়ারি বেসরকারি এলপিজির দাম নিয়ে গণশুনানির আয়োজন করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। আর এর আগেই বাজারে এলপিজির দাম বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

দাম সমন্বয় নিয়ে গণশুনানির আগে এলপিজির দাম বাড়ানোর বিষয়টি কতটা প্রভাব ফেলবে জানতে চাইলে বিইআরসি সদস্য (গ্যাস) মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, এলপিজির দাম বাড়ানোর প্রভাব পড়বে শুনানিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে সর্বোচ্চ কিংবা সর্বনিম্ন দাম ধরে যদি দেশীয় বাজারে এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয় তাহলে ভোক্তা অথবা ব্যবসায়ী—দুই পক্ষের একটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে দুদিকেই এটির প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে।

প্রসঙ্গত, ক্রমবর্ধমানভাবে দেশে এলপিজির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে তা ১০ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। প্রতি বছর এলপিজির চাহিদা বাড়ছে। মোট ১৮টি কোম্পানি গ্রাহকের কাছে এলপি গ্যাস সরবরাহ করছে। যার মধ্যে মাত্র ২০ হাজার টন সরকারি এলপি গ্যাস কোম্পানি সরবরাহ করছে। বাকিটা বেসরকারি এলপিজি কোম্পানিগুলো সরবরাহ করছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এলপি গ্যাস কোম্পানির বাজারজাত করা এলপিজি সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি হয়। সাড়ে ১২ কেজির প্রতি সিলিন্ডার এলপিজি ৬০০ টাকায় বিক্রি করছে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে বেসরকারি খাতের এলপিজি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপণন-সংশ্লিষ্টদের দাবি, দেশে পণ্যটির দাম বাড়লেও তা আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বেশ সহনশীল পর্যায়েই রয়েছে। বসুন্ধরা এলপি গ্যাস কোম্পানির হেড অব ডিভিশন (সেলস) প্রকৌশলী জাকারিয়া জালাল বণিক বার্তাকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বাড়লে দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। গত ছয় মাসের হিসাব ধরলে এ সময় কাঁচামালের দাম বেড়েছে টনে ২০০ ডলার। সে অনুযায়ী বসুন্ধরা এলপিজির সিলিন্ডারপ্রতি মূল্য ২০০ টাকা করে বাড়ার কথা। কিন্তু আমাদের সিলিন্ডারের (১২ কেজি ওজনের) গড় দাম বেড়েছে ১০০-১২০ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য বিবেচনায় দেশে পণ্যটির দাম আরো বাড়ার কথা।

পেট্রোম্যাক্স এলপিজির চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) ফিরোজ আহমেদের বক্তব্যও অনেকটা এ কথারই পুনরাবৃত্তি। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বেড়েছে। সে অনুযায়ী বাংলাদেশে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম অন্তত ১০০ টাকা করে বাড়ার কথা। কিন্তু গ্রাহকের কথা চিন্তা করে আমরা সেটি ৮০ টাকা পর্যন্ত রেখেছি। সীমিত লাভে এ ব্যবসায় যে প্রতিযোগিতা, সে অনুযায়ী গ্রাহকের কাছে সর্বনিম্ন মূল্যে পণ্যটি সরবরাহ করছি।

এদিকে পণ্যটির মূল্যবৃদ্ধিতে গ্রাহকদের মধ্যে কিছুটা ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে বলে জানালেন খুচরা বাজারের এলপিজি বিক্রেতা সাতক্ষীরার মফিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, নতুন বছরের শুরুতেই বাজারে এলপি গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় গ্রাহকরাও কিছুটা ক্ষুব্ধ। কী কারণে দাম বেড়েছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলছেন তারা। করোনার কারণে দরপতনের পর মহামারী চলাকালেই আবার তা কীভাবে বাড়ল, সে বিষয়ে জানতে চাইছেন তারা।বণিক বার্তা

Check Also

বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ শেখ কামালের ৭২তম জন্মবার্ষিকী আজ

প্রতিবেদক: সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ছেলে, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *