ঢাকার যানজট মুক্তির স্বপ্নপূরণে যত উদ্যোগ

ঢাকা মহানগরী ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার যানজট নিরসনে দীর্ঘ মেয়াদে উচ্চা বিলাসী প্রকল্প নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট ৬টি মেট্রোরেল নির্মাণ করবে। এই ৬টির আওতায় মোট ১২৮ দশমিক ৭৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রো রেল নির্মাণ করা হবে। তার মধ্যে উড়াল ৬৭ দশমিক ৫৬৯ কিলোমিটার এবং পাতাল ৬১ দশমিক ১৭২ কিলোমিটার মেট্রো রেল নির্মাণ করা হবে। এসব লাইনে মোট ১০৪টি স্টেশন থাকবে। যার মধ্যে উড়াল স্টেশন হবে ৫১টি এবং পাতাল হবে ৫৩টি। এই শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকাকে যানজটমুক্ত করতে চায় সরকার।

এই ৬ মেট্রো রেলের নির্মাণ কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। অধিকাংশের কাজ প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি এমআরটি লাইন-৬ এর, যা উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত। ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এর কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। তবে প্রথম অংশ বা উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত উদ্বোধন করা হবে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে চলতি বছরের ১৬ ডিসেম্বর।

সম্প্রতি মেট্রো রেলের এমআরটি লাইন-৬ পরিদর্শন শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশের জন্ম হচ্ছে। তার উদারহণ আজকে প্রায় ১ ঘণ্টা আমরা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। বীর শহীদদের স্মরণ করি, কারণ তাদের ত্যাগের ফলে সৃষ্ট বাংলাদেশে আমরা এসব কাজ করতে পারছি। এখানে দেখতে এসে বিশেষ করে আমার মতো একজন বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক, আমি আবেগে আপ্লুত। আমরা এই কাজ দেখে যাচ্ছি। আপনাদের যাদের বয়স অনেক কম, এর পরিপূর্ণ রূপ তারা দেখবেন।’

২০৩০ সালের মধ্যে এই ৬টি মেট্রো রেল সমন্বয়ের মাধ্যমে চালু করতে সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)।

ডিএমটিসিএল সূত্র জানায়, ২০৩০ সালের মধ্যে এই ৬টি মেট্রো রেল নির্মাণ কাজ তিন পর্যায়ে শেষ করা হবে। প্রথম পর্যায়ে ২০২৪ সালের মধ্যে এমআরটি লাইন-৬ বা উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত। তবে সরকার এই সময় কমিয়ে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রো রেলের নির্মাণ কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০২৬ সালের মধ্যে এমআরটি লাইন-৬ এবং ২০২৮ সালের মধ্যে এমআরটি লাইন-৫ : নর্দান রুটের নির্মাণ কাজ শেষ করা হবে।তৃতীয় পর্যায়ে ২০৩০ সালের মধ্যে এমআরটি লাইন-৫ : সাউদার্ন রুট, এমআরটি লাইন-২ এবং এমআরটি লাইন-৪ নির্মাণ কাজ শেষ করা হবে।

চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত এই মোট ৬টি মেট্রো রেলের কাজ কতদূর এগিয়েছে, এর গতিপথ কোন পর্যায়ে রয়েছে সে বিষয়ে বিস্তারিত ডিএমটিসিএলের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তুলে ধরা হলো।

বাংলাদেশের প্রথম উড়াল মেট্রো রেল
২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলিত খরচে উত্তরা তৃতীয় পর্ব থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-৬ বা বাংলাদেশের প্রথম মেট্রো রেলের নির্মাণ কাজের সার্বিক গড় অগ্রগতি ৫৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এই লাইনের প্রথম পর্যায়ে নির্মাণের জন্য নির্ধারিত উত্তরা তৃতীয় পর্ব থেকে আগারগাঁও অংশের পূর্ত কাজের অগ্রগতি ৮০ দশমিক ২১ শতাংশ। দ্বিতীয় পর্যায়ে নির্মাণের জন্য নির্ধারিত আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশের পূর্ত কাজের অগ্রগতি ৫১ দশমিক ২৬ শতাংশ। ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল সিস্টেম এবং রোলিং স্টক (রেলকোচ) ও ডিপো ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ কাজের সমন্বিত অগ্রগতি ৪৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসরণে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৬ বর্ধিত করার জন্য ইতোমধ্যে অংশীজন সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। হাউজহোল্ড জরিপ চলছে। সোশ্যাল স্টাডি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ অংশের দৈর্ঘ্য ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার।

বাংলাদেশের প্রথম পাতাল মেট্রো রেল
৩১ দশমিক ২৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১ দুটি অংশে বিভক্ত। অংশ দুটি হলো- বিমানবন্দর রুট (বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর) এবং পূর্বাচল রুট (নতুন বাজার থেকে পিতলগঞ্জ ডিপো পর্যন্ত)। বিমানবন্দর রুটের মোট দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৮৭২ কিলোমিটার এবং পাতাল স্টেশন সংখ্যা মোট ১২টি। এ রুটেই বাংলাদেশে প্রথম পাতাল বা আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেল নির্মিত হতে যাচ্ছে। পূর্বাচল রুটের মোট দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ৩৬৯ কিলোমিটার। এ অংশ সম্পূর্ণ উড়াল হবে এবং মোট স্টেশন সংখ্যা ৯টি। তার মধ্যে সাতটি স্টেশন হবে উড়াল। নতুন বাজার ও যমুনা ফিউচার পার্ক স্টেশন দুটি বিমানবন্দর রুটের অংশ হিসেবে পাতাল নির্মিত হবে। নতুন বাজার স্টেশনে ইন্টার-চেঞ্জ থাকবে। এ ইন্টার-চেঞ্জ ব্যবহার করে বিমানবন্দর রুট থেকে পূর্বাচল রুটে এবং পূর্বাচল রুট থেকে বিমানবন্দর রুটে যাওয়া যাবে।

উভয় রুটের সব বিস্তারিত স্টাডি, সার্ভে ও বেসিক ডিজাইন সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে ডিটেইলড ডিজাইনের কাজ চলমান, এর অগ্রগতি ৬৫ শতাংশ। এমআরটি লাইন-১ এর ডিপো ও ডিপো এক্সেস করিডোর নির্মাণের জন্য নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার পিতলগঞ্জ ও ব্রাহ্মণখালী মৌজায় ৯২ দশমিক ৯৭২৫ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসক ইতোমধ্যে এলএ কেইস নম্বর-১০/২০১৯-২০২০ রুজু করেছেন। বর্তমানে রোয়েদাদ প্রস্তুতের কার্যক্রম চলমান।

এমআরটি লাইন-৫ : নর্দান রুট
২০২৮ সালের মধ্যে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত পাতাল ও উড়াল সমন্বয়ে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল নির্মাণ করা হবে। তার মধ্যে পাতাল ১৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার এবং ৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার উড়াল মেট্রোরেল হবে। এতে ১৪টি স্টেশন থাকবে। যার মধ্যে ৯টি পাতাল এবং ৫টি উড়াল হবে। ইতোমধ্যে এর সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়েছে। বিভিন্ন জরিপ ও মূল নকশার কাজ চলছে। মূল নকশা কাজের অগ্রগতি ৫০ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

এমআরটি লাইন-৫ : সাউদার্ন রুট
২০৩০ সালের মধ্যে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ৪০ কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণ করা হবে। তার মধ্যে পাতাল ১২ দশমিক ৮০ কিলোমিটার এবং উড়াল ৪ দশমিক ৬০ কিলোমিটার। এতে মোট ১৬টি স্টেশন থাকবে। তার মধ্যে ১২টি পাতাল এবং ৪টি উড়াল। এর প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন করা হয়েছে। এই মেট্রোরেলের জন্য প্রজেক্ট রেডিনেস ফাইনেন্সিংয়ের (পিআরএফ) জন্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

এমআরটি লাইন-২
২০৩০ সালের মধ্যে গাবতলী থেকে চট্টগ্রাম রোড পর্যন্ত উড়াল ও পাতাল সমন্বয়ে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ জি২জি ভিত্তিতে পিপিপি পদ্ধতিতে এমআরটি লাইন-২ নির্মাণের লক্ষ্যে জাপান ও বাংলাদেশ সরকার সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। জি২টি ভিত্তিতে পিপিপি পদ্ধতিতে এমআরটি লাইন-২ বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। এ লক্ষ্যে জাপান ও বাংলাদেশের অংশগ্রহণে ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রথম প্ল্যাটফর্ম সভা, ২০১৮ সালের ৭ জুন দ্বিতীয় প্ল্যাটফর্ম সভা এবং ২০১৯ সালের ২১ মার্চ তৃতীয় প্ল্যাটফর্ম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এমআরটি লাইন-২ এর পিপিপি রিসার্চ সম্পন্ন করে ২০২০ সালের মার্চে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। নিয়োজিত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রিলিমিনারি স্টাডি করছে, যার অগ্রগতি ৫০ শতাংশ।

এমআরটি লাইন-৪
এমআরটি লাইন-৪ এরও নির্মাণ কাজ শেষ করা হবে ২০৩০ সালের মধ্যে। পিপিপি পদ্ধতিতে কমলাপুর-নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে ট্রাকের পাশ দিয়ে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ উড়াল মেট্রো রেল হিসেবে এমআরটি লাই-৪ নির্মাণের উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন।

Check Also

নেত্রকোনায় বজ্রপাতে ৭ কৃষকের মৃত্যু

নেত্রকোনার কেন্দুয়া, মদন ও খালিয়াজুরীতে মাঠে কাজ করতে গিয়ে বজ্রপাতে সাতজন কৃষক মারা গেছেন। এছাড়া …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *